আমাদের দেশে জোকার-এর পরিচিতি মূলত হিথ লেজারকে দিয়ে। ক্রিস্টোফার নোলানের ব্যাটম্যানে জোকার চরিত্রে হিথ লেজারের অভিনয়ের জন্যই চরিত্রটি বিপুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আর তাই আমাদের দেশে ব্যাটম্যানের খলনায়ক বলতে জোকারের কথাই মনে পড়ে। জোকার সম্পর্কে তাই অনেকগুলো ভুল ধারণাই লালন করি আমরা। এমন ভুল ধারণা কেবল আমাদের দেশেই না, প্রচলিত আছে সব দেশের দর্শকদের মাঝেই।
জোকারের জন্ম :
জোকার চরিত্রটি কীভাবে সৃষ্টি হলো? এ বিষয়ে একটি গল্প বেশ প্রচলিত। অনেকেরই ধারণা, জেরি রবিনসন নাকি একদিন তাস খেলছিলেন। তখন হঠাৎ করেই জোকারের তাস দেখে তার এই চরিত্রের কথা মাথায় আসে। আসল ঘটনা কিন্তু একদমই ভিন্ন। শুধু ঘটনাই নয়, চরিত্রও ভিন্ন। জোকার চরিত্রের স্রষ্টা বব কেইন এবং বিল ফিঙ্গার। ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত হয় ভিক্টর হুগোর উপন্যাস দ্য ম্যান হু লাফস। পরে সে উপন্যাস অবলম্বনে একই নামে সিনেমা বানানো হয় ১৯২৮ সালে। কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন কনরাড ভেইট। তার অভিনীত চরিত্র থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে বব-বিল জোকার চরিত্রের কথা ভাবেন।
জোকারের নাম কী?
অনেকেরই ধারণা, জোকারের আসল নাম জ্যাক নেপিয়ার। মূলত ১৯৮৯ সালের জ্যাক নিকোলসনের ব্যাটম্যান সিনেমা থেকেই সবার এই ধারণা হয়েছে। আসলে কিন্তু জোকারের প্রকৃত নাম কী, সেটা কখনোই স্পষ্ট করে বলা হয়নি। অন্য সব জায়গায় ওর নাম বলা হয়েছে স্রেফ জ্যাক। অবশ্য কমিকসেও দু-এক জায়গায় ওর নাম বলা হয়েছে জ্যাক নেপিয়ার। তবে সেটাও সব জায়গায় না। আসলে জোকারের প্রকৃত নাম যে কী, সেটা স্পষ্ট করে কখনোই জানানো হয়নি।
জোকারের জীবনের গল্প :
জোকারের আবির্ভাব এখন থেকে প্রায় ৭৫ বছর আগে। কিন্তু খলনায়ক হওয়ার আগে জোকার কে ছিল? কেন-ই বা সে এমন ভয়ংকর হয়ে উঠল? অর্থাৎ জোকারের জীবনের গল্পটা কী? কেউ জানে না। ডিসি কমিকস কখনোই সে গল্প বলেনি। বরং সে গল্প নিয়ে এক ধরনের রহস্য তৈরি করে রেখেছে। এক কমিকসে তো জোকারের একটা সংলাপই আছে, আমার অতীতের গল্প যদি থাকতেই হয়, তবে আমি তাতে অনেকগুলো বিকল্প রাখতে চাই। হিথ লেজারের জোকারও তাই তার অতীতের কথা বলতে গিয়ে, তিন বারে তিনটি আলাদা কাহিনি বলে।

কাটা-মুখ, নাকি হাসি-মুখ?
জোকারের চেহারার চিহ্ন হলো হাসি-মুখ। আর সিনেমার কল্যাণে সবার ধারণা, এই হাসি-মুখের উৎস ঠোঁটের দুই পাশের গালের ক্ষত। এই কাটা-মুখ কিন্তু কমিকসে নেই। ওখানে জোকার এমনিই সর্বক্ষণ হাসছে। তবে রাসায়নিক বিস্ফোরণের স্মৃতি হিসেবে কমিকসের জোকারের মুখও কাগজের মতো ফ্যাকাশে, চুল সবুজ, ঠোঁট জোড়া টকটকে লাল। পরে সিনেমাতে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কাটা-মুখ।
মূমুর্ষূ জোকার :
জোকার চরিত্রটি প্রথম যখন সৃষ্টি করা হয়, তখন চরিত্রটি নিয়ে তেমন কোনো সুদূরপ্রসারী চিন্তা-ভাবনাই ছিল না ডিসি কমিকসের। তাদের নাকি পরিকল্পনা ছিল, জোকারকে প্রথম কিস্তিতেই মেরে ফেলার! পরে সব দেখেশুনে তাদের মনে হয়, চরিত্রটিকে অন্তত কিছুদিন টেনে নেয়া উচিত। সে যাত্রায় তাই জোকার মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যায়। আর তার পরেরটুকু তো ইতিহাস।
জোকারের অন্তর্ধান, জোকারের পুনরুত্থান :
১৯৬৪ সালে শেষ দেখা দিয়ে অনেকদিন জোকারের কোনো খোঁজ ছিল না। প্রায় এক দশক অন্তর্ধানে ছিল সে। তাকে ফিরিয়ে আনার কৃতিত্ব মূলত ডেনিস ও’নিল এবং নিল অ্যাডামসের। তাদের হাত ধরে ১৯৭৩ সালে দ্য জোকার’স ফাইভ রিভেঞ্জ গল্প দিয়ে জোকার আবার ফিরে আসে ব্যাটম্যান ফ্র্যাঞ্চাইজিতে।
জোকারের পরিবর্তন :
জোকারের এই অন্তর্ধান-পুনরুত্থানের ফাঁকে জোকার চরিত্রের আমূল পরিবর্তন ঘটে যায়। অন্তর্ধানের আগে জোকার ছিল নিতান্তই এক পার্শ্ব-খলনায়ক। অবশ্য সে আগাগোড়াই উচ্চ-শিক্ষিত, বুদ্ধিমান। বিশেষ করে রসায়নশাস্ত্রে তার দখল অসাধারণ। একাডেমিক পড়াশোনার বাইরেও তার জানাশোনার পরিধি বেশ ভালো। তবে অন্তর্ধানের আগে খুনখারাপির চেয়ে তার বেশি আগ্রহ ছিল শিল্পকর্ম আর মণিরত্নের প্রতি। আর অন্তর্ধানের দশককাল পরে তার পুনরুত্থান ঘটে এক পাগলাটে, ঠাণ্ডা মাথার খুনে হিসেবে। খুন করতে গিয়ে যার একবারও দ্বিধা হয় না, একটুও হাত কাঁপে না। কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই যে অজস্র মানুষকে খুন করতে পারে।
ব্যাটম্যান-জোকার সম্পর্ক :
ব্যাটম্যান নায়ক, জোকার খলনায়ক। কাজেই তাদের দুজনের সম্পর্ক নিশ্চয়ই খুব খারাপ। সাদা চোখেও তেমনই মনে হয়। আসলেও কী তাই? সব বিবেচনা করলে কিন্তু মনে হয়, এরা দুজন দুজনের পরিপূরক। একজনকে ছাড়া আরেকজন অপূর্ণ। দুজনের চরিত্রও সম্পূর্ণ বিপরীত। যাকে বলে, একজন মুদ্রার এপিঠ, আরেকজন উল্টোপিঠ। শুধু তাই না, একবার যখন জোকারের ধারণা হলো সে ব্যাটম্যানকে মেরে ফেলেছে, সে কিন্তু ঠিক খুশি হতে পারেনি!
যেখানে ব্যাটম্যান সেখানেই জোকার :
বিভিন্ন সময়ে ব্যাটম্যান ডিসি কমিকসের বাইরেও আত্মপ্রকাশ করেছে। আর ব্যাটম্যানের সঙ্গে সঙ্গে জোকারও ডিসি কমিকসের বাইরে থেকে ঘুরে এসেছে। ১৯৯৫ সালে ডিসি এবং মার্ভেল মিলে ব্যাটম্যান-স্পাইডারম্যানের যৌথ কমিকস প্রকাশ করে। সেখানে স্পাইডারম্যানের খলনায়ক কার্নেজ-এর সঙ্গে ব্যাটম্যানের খলনায়ক হিসেবে যোগ দেয় জোকার। ডিসি পরে ২০০০ এডি-র সঙ্গে ব্যাটম্যান-জাজ ড্রেড-এর যৌথ কমিকস বের করলে, সেখানেও জোকারকে দেখা যায়। ডিসির এরকম প্রজেক্টে জোকার প্রথম কাজ করে ১৯৭২ সালে। আর সেটিই সবচেয়ে মজার ঘটনা। তখনও জোকার ভয়ংকর খুনে হয়ে ওঠেনি। সে বছর হ্যানা বারবারা-র সঙ্গে ডিসি কমিকস প্রকাশ করে। স্কুবি ডু-র দলবলের সঙ্গে অভিযানে নামে ব্যাটম্যান-রবিন। সেখানে খলনায়ক হিসেবে পেঙ্গুইনের সঙ্গে জোকারও ছিল।



No comments:
Post a Comment